নকিয়া ৮ : ক্যামেরা, পারফরমেন্সে সম্পর্কে জেনে নিন বিস্তারিত

এক সময় ক্যামেরা ফোন মানেই নকিয়া – এমনটিই ছিল প্রতিষ্ঠিত সত্য।

মাঝে কিছু দিন এ ব্র্যান্ড হারিয়ে গেলেও ৮০৮ পিউরভিউ বা লুমিয়া ১০২০ ফোনগুলোর সঙ্গে অন্য সব ফোনের ক্যামেরার তুলনা করা হতো।

বেশিরভাগ সময়ই দেখা গেছে কোনো ফোনই এ দুটি ডিভাইসের সঙ্গে ঠিক পেরে ওঠেনি। ২০১৭ সালে নকিয়া আবার নতুন করে শুরু করেছে। বাজারে এ প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে বেশ আলোচনাও শুরু হয়েছে। এক সময়ের জনপ্রিয় এ ব্র্যান্ড কি হারানো সেই গৌরব ফিরে পাবে নকিয়া ৮-এর মাধ্যমে? চলুন দেখা যাক।

এক নজরে নকিয়া ৮ 

  • ৫.৩ ইঞ্চি, ১৪৪০ x ২৫৬০ রেজুলেশনের কোয়াড-এইচডি আইপিএস এলসিডি ডিসপ্লে
  • কোয়ালকম স্ন্যাপড্রাগন ৮৩৫, ২.৫ গিগাহার্জ গতিসম্পন্ন ক্রাইয়ো কোর সমৃদ্ধ অক্টাকোর প্রসেসর
  • অ্যাড্রিনো ৫৪০ জিপিউ
  • ৪ জিবি র‌্যাম
  • ৬৪ জিবি স্টোরেজ। তবে মেমরি কার্ডের মাধ্যমে বাড়ানো যাবে
  • অ্যান্ড্রয়েড ৭.১.১ নুগাট অপারেটিং সিস্টেম, দ্রুতই ৮.০ ওরিও আপডেট পাওয়া যাবে
  • দুটি ১৩ মেগাপিক্সেল, f/2.0 অ্যাপারচার ব্যাক ক্যামেরা (যার একটি সাদাকালো), অপ্টিক্যাল স্ট্যাবিলাইজেশন সমৃদ্ধ কার্ল জাইস অপ্টিকস ও ডুয়াল টোন এলইডি ফ্ল্যাশ
  • ২১৬০পি অর্থাৎ ফোর-কে রেজুলেশন পর্যন্ত ভিডিও ধারণের সুবিধা, ভিডিওর সঙ্গে উন্নতমানের সাউন্ড রেকর্ডের জন্য রয়েছে নোকিয়া ওজও অডিও
  • ১৩ মেগাপিক্সেল, f/2.0 অ্যাপারচারের অটোফোকাস সমৃদ্ধ ২১৬০পি ভিডিও ধারণক্ষমতা সম্পন্ন ফ্রন্ট ক্যামেরা
  • ডুয়াল ব্যান্ড ওয়াই-ফাই, ব্লুটুথ ৫, জিপিএস, এনএফসি
  • ২৪ বিট, ১৯২ কিলোহার্জ হাই ফিডেলিটি অডিও, ৩.৫ মিলিমিটার হেডফোন জ্যাক
  • ইউএসবি টাইপ-সি, ৩.১ জেনারেশন ১ স্পিডের পোর্ট
  • সামনে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর
  • কোয়ালকম কুইক চার্জ ৩ সাপোর্ট
  • ৩০৯০ এমএএইচ ধারণক্ষমতার ব্যাটারি
  • আইপি ৫৪ রেটিং, অল্পবিস্তর পানিরোধক

ডিজাইন
অ্যালুমিনিয়াম বডিতে কালো, গভীর নীল, তামাটে ও রূপালী চারটি রঙে বাজারে আনা হয়েছে ফোনটি। প্রতিটি রঙই পলিশ করা বডিতে সুন্দরভাবে মানিয়ে গেছে। তবে আঙুলের ছাপ ফুটে ওঠার সমস্যাটি আজও প্রকট।

অ্যালুমিনিয়াম ইউনিবডি ডিভাইসের মূল সমস্যা অ্যান্টেনা লাইন। নকিয়া এ ক্ষেত্রে উপরে ও নিচে দুটি অ্যান্টেনা ব্যান্ড ব্যবহার করায় সেটি তেমন নজরে আসবে না।

ফোনটির পেছনের মাঝ বরাবর রয়েছে লোগো। তার ওপরে রয়েছে লম্বাটে ক্যামেরা বাম্প। বাম্পটি নকিয়া ৫ বা ৬ এর চাইতেও লম্বা। তবে ডুয়াল ক্যামেরা, ফ্ল্যাশ ও লেজার অটোফোকাস সেন্সরের জন্য জায়গা করতে তা প্রয়োজনীয়।

এ ছাড়া ফোনের ডানে পাওয়ার ও ভলিউম বাটন, বামে সিম ও মেমরি কার্ড স্লট, ওপরে হেডফোন জ্যাক ও নিচে রয়েছে মাইক্রোফোন, স্পিকার ও ইউএসবি টাইপ সি পোর্ট।

সামনে ডিসপ্লের নিচে মাঝ বরাবর দেওয়া হয়েছে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর, দুপাশে ক্যাপাসিটিভ বাটন ও স্ক্রিনের ওপরে রয়েছে ইয়ারপিস ও ফ্রন্ট ক্যামেরা।

ক্যামেরাটিতে থাকা জাইস লেন্স ও অটোফোকাস সুবিধা খুব কম ফোনেই রয়েছে। বিশেষত জাইস লেন্স আর কোনো ফোনে নেই। অতএব ক্যামেরা ফোন হিসেবে নকিয়া ৮ নিজের নাম খুব ভালোভাবে প্রতিষ্ঠা করার দিকে নজর দিচ্ছে, সন্দেহ নেই।

ডিসপ্লে
আর দশটি নির্মাতার মত ফ্যাবলেট সাইজের দিকে না দৌঁড়ে নকিয়া ফ্ল্যাগশিপ ফোনের জন্য বেছে নিয়েছে ৫.৩ ইঞ্চি ডিসপ্লে। কোনো ঘাটতি না রাখতে দেওয়া হয়েছে ১৪৪০ x ২৫৬০ পিক্সেল রেজুলেশন ও ৭০০ নিট ব্রাইটনেস।

এ কারণে সরাসরি রোদেও ৭০০ নিট ব্রাইটনেসের ডিসপ্লে দেখতে কোনো প্রকার সমস্যা হবার কথা নয়।

আর ৫৫৪ পিপিআই ঘনত্বের ডিসপ্লেটি ভিআর হেডসেট ব্যবহারেও অনন্য। আইপিএস এলসিডি সাধারণত অ্যামোলেড স্ক্রিনের ন্যায় কন্ট্রাস্ট দিতে পারে না। এ ক্ষেত্রে সেটি নিয়েও চিন্তা নেই। কেননা ১৮৪০:১ কন্ট্রাস্ট সুপার অ্যামোলেডের মত না হলেও চোখে লাগার মত নয়, কালো দেখে গ্রে মনে হবে না। কালার গ্যামুটের দিক থেকেও ডিসপ্লেটি এগিয়ে রয়েছে, ডেল্টা ই মাত্র ৫.৫।

সব মিলিয়ে, ডিসপ্লের দিক থেকে ফ্ল্যাগশিপ যে কোনো ফোনের সমকক্ষ এ ফোন।

পারফরমেন্স 

স্ন্যাপড্রাগন ৮৩৫ চিপ সমৃদ্ধ ডিভাইস সবচেয়ে শক্তিশালী ফোনের একটি হবে সেটি ধরেই নেওয়া যায়। গিকবেঞ্চ সিঙ্গেলকোর ও মাল্টিকোর বেঞ্চমার্কের স্কোর অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইসের মধ্যে একমাত্র ওয়ানপ্লাস ৫ ছাড়া বাকি সবার ওপরে রয়েছে নকিয়া ৮। তবে ওয়ানপ্লাস ৫ বেঞ্চমার্কের সময় নিজ থেকেই প্রসেসরের স্পিড বাড়ানোর দায় স্বীকার করায় সেটি ধরা ঠিক নয়।

গ্রাফিক্স পারফরমেন্সেও একই চিত্র দেখা গেছে। যা অস্বাভাবিক নয়। ওয়ানপ্লাস ৫ ফোনটির ডিসপ্লে মাত্র ফুল এইচডি। ফলে একই জিপিউ সেই ফোনে আরও অল্প লোডে কাজ করতে সক্ষম। তারপরও নকিয়া ৮ জিএফএক্স বেঞ্চ ৩.১ ম্যানহাটানে ৩৯ এফপিএস স্কোর করতে সক্ষম, যা আইফোন ৭ প্লাসের চেয়ে বেশি ও গ্যালাক্সি এস৮+ এর সমকক্ষ।

৪ জিবি ডিডিআর৪ র‌্যাম মাল্টিটাস্কিং ও বড়সর গেইম চালাতে কোনো বাধা সৃষ্টি করবে না। ৬ জিবি র‌্যাম দেয়া হলে আরো ভালো হতো। সব মিলিয়ে নকিয়া ৮-এর পারফরমেন্সে কোনো ঘাটতি নেই।

ব্যাটারি
স্ন্যাপড্রাগন ৮৩৫ চিপের প্রায় সব ফোনে বড় ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়েছে। সেদিক থেকে এ ফােনের ব্যাটারি লাইফ নিয়ে সন্দেহ রয়েই যাচ্ছে। টানা ব্যবহারে ফোনটি অন্তত দেড় দিন পর্যন্ত ব্যাকআপ ও ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা স্ক্রিন অন দিতে পারবে।

কোয়ালকম কুইক চার্জ ৩ থাকার ফলে ফোনটি ৪৮ শতাংশ চার্জ হতে সময় নেয় মাত্র ৩০ মিনিট।

সাউন্ড কোয়ালিটি
সাধারণত সাউন্ড কোয়ালিটি বিচারে লাউডস্পিকার নিয়ে তেমন কথা থাকে না। তবে এ ফোন এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। জোরালো, স্পষ্ট ও খুবই উন্নমানের সাউন্ড দিতে সক্ষম স্পিকারটি বাজারে থাকা অন্য ফোনকে ছাড়িয়ে যায়।

নকিয়া সবসময়ই স্পিকার ও ইয়ারপিসের সাউন্ডের জন্য বিখ্যাত ছিল। তবে ডুয়াল স্টেরিও স্পিকার না দেয়া ডিজাইনের একটা দুর্বলতা বলা যেতে পারে।

ফোনটি হাই-ফিডেলিটি সাউন্ড দিতে সক্ষম। বিশেষত হেডফোনে প্রতিটি ফ্রিকুয়েন্সিতে একদম সমানভাবে সাউন্ড দিয়ে ফ্ল্যাট সিগনেচার সক্ষম ফোন বাজারে একেবারেই নেই।

সমস্যার শুরু এখানেই; ফোনটিতে কোনো আলাদা অ্যাম্প না থাকায় সাউন্ডের ভলিউম খুবই অল্প-বাজারের বেশীরভাগ ফ্ল্যাগশিপের চেয়ে অনেক কম। ফলে যারা গান শুনতে পছন্দ করেন তাদের সঙ্গে হেডফোন অ্যাম্প ব্যবহারের প্রয়োজন হবে।

সব মিলিয়ে হেডফোন অ্যাম্প ব্যবহার করতে পারলে এ ফোন খুবই ভালো সাউন্ড দিতে সক্ষম।

ক্যামেরা
নকিয়া ৮ ক্যামেরাকেন্দ্রিক স্মার্টফোন। তাই ক্যামেরা পারফরমেন্সে মুখ থুবড়ে পড়লে চলবে না। অল্প কথায়, এটির ক্যামেরা অসাধারণ, যারা ক্যামেরার জন্য ফোনটি নেয়ার কথা ভাবছেন তারা চোখ বুঁজে কিনে ফেলতে পারেন।

১৩ মেগাপিক্সেল দুটি সেন্সর সমৃদ্ধ ব্যাক ক্যামেরার একটি সাদা-কালো ও অপরটি কালার। মনোক্রোম সেন্সর সবসময়ই আরও বেশি ডাইনামিক রেঞ্জ ও কন্ট্রাস্ট তুলতে সক্ষম।

এ ক্ষেত্রেও ব্যাতিক্রম নয়, যদিও হুয়াওয়ের মত মনোক্রম সেন্সরটি আরও বেশি রেজুলেশনের না করার ফলে দুটি সেন্সরের তথ্য একত্রিত করে ছবি তুলতে নকিয়া ৮-এর কম বেগ পেতে হয়। ফলে ছবি তোলার গতি বেড়ে যায়।

ফোকাসিংয়ের জন্য থাকা লেজার ও ফেইজ ডিটেকশন ফোকাসিং কাজটি দ্রুততার সঙ্গে নির্ভুলভাবে করতে পারার কথা। অবশ্য এ ক্ষেত্রে নকিয়ার সফটওয়্যারজনিত ত্রুটি রয়ে গেছে, যা আশা করা যায় পরের হালনাাদেই শুধরে নেওয়া হবে।

ক্যামেরা দিনের আলোতে প্রচুর ডিটেইল সমৃদ্ধ এবং হাই ডাইনামিক রেইঞ্জের ছবি তুলতে সক্ষম। তবে মূল ব্যাপারটি হচ্ছে, অতিরিক্ত শার্পেনিং, নয়েজ বা বেশি স্যাচুরেটেড কালারের সমস্যা এ ফোনে নেই।

স্বল্প আলোতেও এ ফোন খুবই কম নয়েজওয়ালা ছবি তুলতে সক্ষম। এ কারণে সহজেই ওয়ানপ্লাস ৫ বা আইফোন ৭কে টেক্কা দিয়ে গ্যালাক্সি ৮কে চ্যালেঞ্জ করার মত ছবি ডিভাইসটিতে পাওয়া যাবে।

ভিডিওর দিক থেকেও এটি অনেক এগিয়ে রয়েছে। সাধারণত নির্মাতারা ফোনের ভিডিওর রেজুলেশনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শব্দধারণের দিকে তেমন নজর দেন না। নকিয়া সেটি পাল্টে দিতে ৩৬০ডিগ্রি উচ্চমানের সাউন্ড ধারণের ওজও প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে। অর্থাৎ উচ্চমানের ২১৬০পি, অপ্টিক্যাল স্টাবিলাইজেশন সমৃদ্ধ ভিডিওর সঙ্গে হাই-ফাই অডিও থাকার ফলে ফোনটি ভিডিও ক্যামেরা হিসেবে দারুন কাজ করবে।

সামনের ক্যামেরাতেও অটোফোকাস এর আগে এইচটিসি ও অপ্পো ব্যবহার করেছিল। কিন্তু জাইস লেন্সের কারসাজিতে নকিয়া ৮ তাদের ছাড়িয়ে গেছে।

সেলফিতে অদ্বিতীয় বলা না গেলেও এ ক্ষেত্রে বাজারের অনেক ফ্ল্যাগশিপের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে নতুন এ মডেল।

এ ছাড়াও ফোনটিতে ডুয়াল ফটো তোলার বিশেষ মোড রয়েছে। ফলে একই ফ্রেমে সামনের ও পেছনের ক্যামেরা দিয়ে ভিডিও ও চিত্রধারণ দুটোই করা যাবে। মূলত ভিডিও সাংবাদিকদের জন্যই এই মোডটি দেয়া হলেও, ফেইসবুক ও ইউটিউব লাইভের কল্যাণে এটির সেবা নিতে পারবেন প্রায় সবাই।

নকিয়া ৮-এর ক্যামেরার ফোকাসিংয়ের সফটওয়্যার খুঁত ছাড়া আর কোনো খারাপ দিক নেই। বরং অন্যান্য ফোনের ক্যামেরার সঙ্গে তুলনা করে বিচার করলে এটি এগিয়ে থাকবে।

পরিশেষ
নকিয়া ৮ ফ্ল্যাগশিপ বা ফ্ল্যাগশিপ কিলার নয়, প্রচুর কাজ একসঙ্গে করার জন্য তৈরি প্রফেশনাল ফ্যাবলেটও নয়; সরাসরি বলা যায় এটি সবচাইতে শক্তিশালী ক্যামেরা ফোন।

যারা মূলত ক্যামেরার জন্য ফোন কেনার কথা ভাবছেন তাদের জন্য এটি আদর্শ ফোন হতে পারে।

মূল্য

নকিয়া ৮ বিক্রি শুরু হয়েছে গত মাসে। গ্রে মার্কেটে বাংলাদেশী টাকায় ৪৪ হাজার টাকার মতো। তবে নকিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো এর দাম নিয়ে কিছু বলেনি।

এক নজরে ভালো

  • ক্যামেরা
  • ভিডিও
  • পারফরমেন্স
  • বিল্ড কোয়ালিটি
  • দ্রুত আপডেট পাওয়ার প্রতিশ্রুতি

এক নজরে খারাপ 

  • হেডফোনের ভলিউম
  • ব্যাটারি লাইফ
  • ডুয়াল ভিডিওর মানে আরও উন্নতি প্রয়োজন
Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY